এক লুঙ্গি দিয়ে ১২ বছর পার করেছেন মনজুর

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবুল মনজুর (৬০) পেশায় একজন ভিক্ষুক। এটা হরহামেশা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু তার জীবনে আছে ব্যতিক্রম এক গল্প। উপহার পাওয়া এক লুঙ্গি গত ১২ বছরে পরেছেন মাত্র ২৪ বার। বছরে মাত্র দুবার করে পরার কারণ জানতে গিয়ে জানা গেল হৃদয়বিদারক ঘটনা।

কেন একই লুঙ্গি প্রতিবছর পরছেন, তার উত্তর দিতে গিয়ে চোখের পানি আটকাতে পারেননি আবুল মনজুর। তিনি জানান, ১৩ বছর আগে পাশের একটি গ্রামে ভিক্ষা করতে গিয়ে এক বাড়ির মালিক তাকে লুঙ্গি উপহার দেন। সেই লুঙ্গি দিয়েই গত ১২ বছর ধরে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন তিনি।
আবুল মনজুর আরও জানান, ঈদের নামাজ আদায় করে ঘরে এসে ওই লুঙ্গি খুলে যত্ন করে সংরক্ষণ করে রাখেন। শুধু দুই ঈদে নামাজ পরার সময় নামান লুঙ্গি। লুঙ্গিটি যাতে পুরোনো না হয়, সে জন্য তিনি শুধু ঈদের নামাজ ছাড়া পরেন না।

আবুল মনজুর টেকনাফ উপজেলা হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের আমতলী এলাকার মৃত নশত আলীর ছেলে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মনজুর পেশায় একজন ভিক্ষুক। ভিক্ষা করেই এখনো টানছেন সংসারের ঘানি। কিন্তু তার এই দায়িত্ব শেষই হয় না।
মনজুরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ছোটবেলায় আবুল মনজুরের বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর শিশুকালেই সংসারের হাল ধরতে নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে। এর মধ্যে একবার এক অসুখে হারিয়ে ফেলেন দৃষ্টিশক্তি।

শৈশব থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে করতে ৫০ বছর পার করে ফেলেছেন মনজুর। এই ৫০ বছরে দেশের ও দেশেও মানুষের ভাগ্যে কত পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মনজুর রয়ে গেলেন আড়ালে। তার ভাগ্যের সিকে ছিঁড়েনি কখনো।
মনজুরের ২ ছেলে ৩ মেয়ে। সব সময় স্বপ্ন দেখেছিলেন দুই ছেলেকে নিয়ে। তারা বড় হবে। হয়তো তার মানুষের কাছে আর হাত পাতার সময় শেষ হবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি। দুই ছেলে বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে। কিন্তু বাবাকে রেখে পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। মনজুর আবারও রয়ে গেলেন অথই সংগ্রামের সাগরে।

মনজুরের মাটির তৈরি ঘরটি অন্তত ৫০ বছরের পুরোনো। যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে মাটির ঘরের দেয়ালটি। দরজা-জানালাবিহীন ভাঙা ঘরে বহুকাল বসবাস করছেন স্ত্রী জাহানারাকে নিয়ে। খাসজমিতে হাতে গড়া ছোট মাটির ঘরটি দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চালের টিনগুলো অনেক আগেই ফুটো হয়ে বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি ঢোকে।
আক্ষেপ করে মনজুর বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের জীবনে কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। সরকারের বিনামূল্যে ঘর দেওয়ার বিষয়টি তিনি শোনার পর স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে অনেকবার ধরনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভিক্ষুক মনজুরের আকুতি ইউপি সদস্যের হৃদয়ে পৌঁছায়নি। তবে তিন মাস আগে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে ভুল করেননি তিনি।

আবুল মনজুরের স্ত্রী জাহানারা (৫০) বলেন, এক টুকরো কাপড় আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। ঈদের সময় কেউ কাপড় সাহায্য করছে খবর পেলে আমার স্বামী ছুটে যান। কিন্তু একবারও পাননি তিনি। কয়েকবার ত্রাণের কাপড় নিতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে তার পা ভেঙে গেছে। আজ পর্যন্ত কোনো রকম সরকারি সহয়তা পাইনি।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের যুব অধিকার বাস্তবায়ন সংঘের সদস্য মোহাম্মদ ফারুক বলেন, আবুল মনজুরের করুণ অবস্থা আমাদের হৃদয় নাড়া দেয়। আমরা সেই শৈশব থেকেই দেখেই আসছি তিনি ভিক্ষাবৃত্তির জীবন পার করছেন। সরকার পরিবর্তন হলেও মনজুরের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। প্রবাসী বিত্তবানদের ও সরকারি সহযোগিতা পেলে শেষ বয়সে হলেও একটু সুখের দেখা পেতে পারেন।
মনজুর আলমের এমন দুর্দশা দেখতে গিয়ে এই প্রতিবেদক কিছু ঈদ উপহার নিয়ে যান। ঈদ উপহার পেয়ে মনজুর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.